সাকিব আহসান পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও ।
উত্তরাঞ্চলের জনপদ ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক সচেতনতার জন্য পরিচিত। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান পর্ব, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকে এই অঞ্চলের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আদর্শভিত্তিক রাজনীতি ধীরে ধীরে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও
ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে রূপ নেয়। এর ফলে রাজনৈতিক নীতিবোধ, ত্যাগ ও গণমানুষের প্রতিনিধিত্বের জায়গায় প্রবেশ করে প্রভাব বিস্তার, দলীয় বিভাজন, সুবিধাবাদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার।
ঐতিহাসিকভাবে পীরগঞ্জ ছিল কৃষিনির্ভর ও সামাজিকভাবে রক্ষণশীল এলাকা। তবুও ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা ও মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানকার মানুষ রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিল। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর হামলায় পীরগঞ্জে গণহত্যা
সংঘটিত হয়। শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। স্থানীয় মানুষের প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগ এই অঞ্চলের রাজনৈতিক চেতনার শক্ত ভিত তৈরি করেছিল।
কিন্তু স্বাধীনতার পর জাতীয় রাজনীতির মতো স্থানীয় রাজনীতিতেও শুরু হয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। প্রথমদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বে মতাদর্শ ও সাংগঠনিক ত্যাগের মূল্য থাকলেও ধীরে ধীরে পরিবারতন্ত্র, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং পেশিশক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আশির দশক থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও দলীয় প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি পীরগঞ্জে সামাজিক বিভাজন বাড়াতে শুরু করে।
নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। রাজনৈতিক দলগুলো স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করার নামে বিভক্তি, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সুবিধাবাদী নেতৃত্বকে প্রশ্রয় দিতে থাকে। বিভিন্ন সময়
স্থানীয় সম্মেলন ও কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সংঘাত, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও উপজেলা পর্যায়ের দলীয় সম্মেলনে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা নিয়ে জটিলতা দেখা গেছে।
রাজনৈতিক নীতিভ্রষ্টতার অন্যতম বড় উদাহরণ হলো দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের সংস্কৃতি। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো উত্তরাঞ্চলেও ত্রাণ বিতরণ, সরকারি প্রকল্প ও স্থানীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দলীয় প্রভাবের অভিযোগ বহুবার উঠেছে। এমনকি
রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ত্রাণ আত্মসাতের ঘটনাও জাতীয় সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এসব ঘটনা স্থানীয় জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
পীরগঞ্জের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে আদর্শিক রাজনীতি থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতিতে রূপান্তরের মাধ্যমে। একসময় ছাত্ররাজনীতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে নেতৃত্ব তৈরি হলেও এখন অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও ক্ষমতার নৈকট্য অনেক
ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব নির্ধারণ করে। ফলে তৃণমূলের কর্মী ও সাধারণ মানুষের মতামত উপেক্ষিত হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, আগে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সামাজিক সম্পর্ক অটুট থাকত। কিন্তু বর্তমানে রাজনৈতিক পরিচয় সামাজিক বিভক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউনিয়ন থেকে উপজেলা পর্যন্ত বিভিন্ন
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ নিচ্ছে। এতে সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে।
এ অঞ্চলের রাজনীতিতে সীমান্তবর্তী অবস্থানেরও প্রভাব রয়েছে। ভারত সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় চোরাচালান, অবৈধ বাণিজ্য ও স্থানীয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে বহু সময় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব বিষয়ে সবসময় আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায় না, তবুও স্থানীয় আলোচনায় বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত।
একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনীতির ভাষা ও আচরণকে আরও আক্রমণাত্মক করেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে যুক্তির বদলে অপমান, গুজব ও ব্যক্তিগত
আক্রমণের মাধ্যমে মোকাবিলা করার প্রবণতা বেড়েছে। এতে গণতান্ত্রিক সহনশীলতা কমছে। জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক মেরুকরণও স্থানীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে।
তবে পীরগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাস কেবল নীতিভ্রষ্টতার গল্প নয়। এখানকার মানুষ এখনও রাজনৈতিকভাবে সচেতন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, গণআন্দোলনের ইতিহাস এবং স্থানীয় সামাজিক বন্ধন এখনও অনেককে মানবিক ও দায়িত্বশীল রাজনীতির স্বপ্ন দেখায়। নাগরিক সমাজ,
সাংবাদিক, শিক্ষক ও তরুণদের একাংশ এখনও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতির পক্ষে কথা বলছেন।
পীরগঞ্জের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে নতুন প্রজন্ম কতটা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে তার ওপর। কারণ ইতিহাস বলে, যখন রাজনীতি আদর্শ হারায়, তখন সমাজে
অবিশ্বাস জন্ম নেয়; আর যখন রাজনীতি মানুষের কল্যাণে ফিরে আসে, তখনই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। পীরগঞ্জের রাজনৈতিক বাস্তবতাও সেই কঠিন সত্যেরই প্রতিচ্ছবি।