বিশেষ প্রতিনিধি:
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার আনোয়ার হোসেনকে ঘিরে উঠেছে নানা গুরুতর অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এলএ শাখায় দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কিংবা জটিল হয়ে ওঠা বিভিন্ন ফাইল ‘ম্যানেজ’ করে এগিয়ে নেওয়া, ক্ষতিপূরণের চেক প্রদান এবং বিভিন্ন অনিষ্পন্ন বিষয় নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ প্রভাব রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ তাঁকে আখ্যা দিচ্ছেন ‘অসম্ভবকে সম্ভব করার কারিগর’ হিসেবে।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত প্রক্রিয়ায় যে কাজ সম্পন্ন হতে দীর্ঘ সময় লাগার কথা, অর্থের বিনিময়ে সেটিই দ্রুত করে দেওয়ার পথ তৈরি হয়।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট নথি, ফাইল চলাচলের রেকর্ড, চেক প্রদান রেজিস্টার এবং ক্ষতিপূরণপ্রাপকদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
‘আনোয়ার আছেন, কাজও হবে’—এমন ধারণা কেন?
এলএ শাখায় বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ, মালিকানা যাচাই, নথিপত্র পরীক্ষা এবং ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ হয়ে থাকে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কাজের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি আনোয়ার হোসেনের মাধ্যমে ফাইলের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দ্রুত সমাধানের আশায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
তাঁদের অভিযোগ, ‘টাকা ছাড়া কাজ হয় না’—এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তাই বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
চেক প্রদান নিয়েও প্রশ্ন
এলএ শাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদান। অভিযোগ উঠেছে, ক্ষতিপূরণের চেক হাতে পাওয়ার প্রক্রিয়াতেও আনোয়ার হোসেনের ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।
কোনো চেক কবে প্রস্তুত হয়েছে, কখন অনুমোদন হয়েছে, কার মাধ্যমে প্রাপকের কাছে পৌঁছেছে এবং সংশ্লিষ্ট ফাইল কতদিন কোন টেবিলে ছিল—এসব তথ্য যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
বিশেষ করে একই ধরনের একাধিক ফাইলের ক্ষেত্রে নিষ্পত্তির সময়ের পার্থক্য থাকলে তার কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
জটিল ফাইল ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, মালিকানা নিয়ে জটিলতা, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সমস্যা, আপত্তি কিংবা নথিগত অসঙ্গতির মতো বিষয় থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি ‘ম্যানেজ’ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
এমন অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগ নয়; বরং সরকারি ভূমি অধিগ্রহণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপরও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।
‘অসম্ভবকে সম্ভব’,নাকি নিয়মের বাইরে যাওয়ার অভিযোগ? আনোয়ার হোসেনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচিত কথাটি—‘অসম্ভবকে সম্ভব করা।’
কিন্তু অনুসন্ধানের প্রশ্ন হলো, তিনি কি দক্ষতার কারণে জটিল বিষয় দ্রুত সমাধান করেন, নাকি নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো সুবিধা করে দেওয়ার অভিযোগের বাস্তবতা রয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে তাঁর হাতে থাকা বা তাঁর মাধ্যমে পরিচালিত ফাইলগুলোর একটি নিরপেক্ষ অডিট প্রয়োজন।
বিশেষ করে কোন ফাইল তাঁর মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়েছে, কোন ফাইল দীর্ঘদিন আটকে ছিল, চেক প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কী এবং আবেদনকারী বা সুবিধাভোগীদের সঙ্গে তাঁর কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করা জরুরি।
অভিযোগের শেষ নেই, তবে প্রমাণ কোথায়?
সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের অভিযোগ, আনোয়ার হোসেনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ দাবি করেন, অর্থ ছাড়া তিনি কোনো কাজ করতে আগ্রহী নন।
তবে সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে ব্যাংক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী, ফাইল মুভমেন্ট, চেক রেজিস্টার, অফিসিয়াল নথি এবং অভিযোগকারীদের লিখিত বক্তব্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরি,ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ সাধারণ মানুষের সম্পদ এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রদানে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অর্থের বিনিময়ে সরকারি সেবা দেওয়ার অভিযোগ থাকলে তা দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এলএ শাখায় ডিজিটাল ফাইল ট্র্যাকিং, চেক প্রদানের স্বচ্ছ তালিকা, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত অভ্যন্তরীণ অডিট চালু করা গেলে এ ধরনের অভিযোগের সুযোগ অনেকটাই কমে আসতে পারে।
আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি,অভিযোগগুলোর বিষয়ে এলএ শাখার আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিবারই তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর অবস্থান ও ব্যাখ্যা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
শেষ কথা,,এলএ শাখায় সত্যিই কি অর্থের বিনিময়ে ‘বন্ধ’ ফাইলের দরজা খুলে যায়, নাকি আনোয়ার হোসেনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অতিরঞ্জিত অভিযোগ—এর উত্তর একমাত্র নথি, প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্তই দিতে পারে।
অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও স্পষ্ট করা জরুরি। কারণ সরকারি ভূমি অধিগ্রহণের অর্থ ও মানুষের অধিকার নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ থাকা উচিত নয়।