ক্রাইম রিপোর্টার মোঃ হাসিবুল ইসলাম।।
রাজধানীর মতিঝিল ও পল্টন এলাকার মতো অতি সংবেদনশীল ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত জোনে ভুয়া গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে এক বেসরকারি চাকরিজীবীকে অপহরণ করে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে টাকা আদায়ের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগীর নাম জোনায়েদ কাসেম চৌধুরী, তিনি স্পেকট্রাম সফটওয়্যার অ্যান্ড কনসালটিং প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে বিজনেস ডেভেলপমেন্ট এক্সিকিউটিভ হিসেবে কর্মরত। গত ১৬ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে এই রোমহর্ষক ঘটনার সূত্রপাত হয়।
ঘটনার বিবরণ জানা গেছে, নিয়মিত কর্মদিবস শেষে মতিঝিলের কর্মস্থল থেকে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফেরার জন্য মেট্রো স্টেশনের দিকে পায়ে হেঁটে রওনা দেন জোনায়েদ। স্টেশনের সিঁড়ি থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরত্বে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা দুই ব্যক্তি সিভিল পোশাকে তার পথ আটকায়। তাদের হাতে ছিল ওয়াকিটকি, আর মুখে ছিল পুলিশের ভুয়া পরিচয়। মুহূর্তেই তারা তাকে ঘিরে ফেলে বিভিন্ন কাল্পনিক মামলার ভয় দেখাতে শুরু করে। সারাদিনের ক্লান্ত শরীরে আকস্মিক এই হুমকিতে দিশেহারা হয়ে পড়েন ভুক্তভোগী।
এরপর জোরপূর্বক তাকে একটি মোটরসাইকেলে তোলা হয়। রূপায়ন টাওয়ারের সামনে থেকে শুরু করে দৈনিক বাংলা মোড়, পল্টন মডেল থানা এলাকা হয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ১ নম্বর গেটের বিপরীত পাশে, মধুমিতা তিতাস পুলিশ অফিসার্স কোয়ার্টার্স সংযোগ সড়কের পার্কিংয়ে দাঁড় করানো একটি পুলিশ ভ্যানে। এলাকাটি সিআইডি ট্রেনিং স্কুল সংলগ্ন হওয়ায় সাধারণত জনবহুল ও নিরাপদ বিবেচিত হলেও, প্রতারক চক্রটি সেখানেই প্রকাশ্যে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যায়।
ভ্যানের ভেতরে বসিয়ে চক্রটি তথাকথিত ‘আয়না ঘর’-এর নানা ধরনের নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে আতঙ্ক আরও তীব্র করে তোলে। চরম মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে বাঁচার উপায় জানতে চাইলে প্রতারকরা মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। তখন ভুক্তভোগী জানান, তার কাছে প্রতিষ্ঠানের বেতনের ৪৮ হাজার টাকা এবং নগদ ১০ হাজার টাকা—মোট ৫৮ হাজার টাকা রয়েছে। এরপর তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে বিকাশে টাকা পাঠাতে বাধ্য করা হয়। পরে শান্তিনগর এলাকার দুটি দোকান থেকে ওই টাকা ক্যাশ আউট করে নেওয়া হয় এবং শেষে শান্তিনগরেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এলাকাবাসী ও পেশাজীবীদের প্রতিক্রিয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম ভাঙিয়ে এমন সুসংগঠিত অপরাধ চক্রের তৎপরতায় স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম উদ্বেগ। মেট্রো স্টেশন ও পল্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় এমন ঘটনা ঘটায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এলাকাবাসী ও পেশাজীবীরা দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশি তদন্তের অগ্রগতি মতিঝিল থানা সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে ভুক্তভোগীর পিতা বাদী হয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিয়ে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। ঘটনার সত্যতা যাচাই ও অভিযুক্তদের শনাক্ত করতে মতিঝিল, দৈনিক বাংলা মোড়, পল্টন এবং রাজারবাগ সংলগ্ন বিভিন্ন স্থাপনার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ চলছে।
তদন্তের দায়িত্বে থাকা এসআই মাসুদ জানান, সিভিল পোশাকে পুলিশ পরিচয় দিয়ে অপরাধ সংঘটনকারী চক্রটিকে শনাক্ত করতে প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব শিগগিরই অভিযুক্তদের অবস্থান চিহ্নিত করে তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।
এ ঘটনার পর থেকে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভুয়া পরিচয়ে অপরাধ প্রতিরোধে সাধারণ মানুষকে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারও পরিচয়পত্র যাচাই না করে বা নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ না করে কোনো অবস্থাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দাবিদার ব্যক্তির কথায় সাড়া না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।